1. news@www.banglaroitizzo.com : BanglarOitizzo :
  2. imrankhanbsl01@gmail.com : Imran Khan : Imran Khan
  3. banglaroitizzo.news@gmail.com : newseditor :
সোমবার, ১০ মে ২০২১, ০২:১৩ পূর্বাহ্ন

চন্দ্রদ্বীপ রাজাদের নীল পাগলের দল!

শংকর লাল দাশ
  • প্রকাশিত: শনিবার, ১৭ এপ্রিল, ২০২১
  • ৭৬২ বার পড়া হয়েছে
শংকর লাল দাশ
ফাইল ছবি

নীলপূজা যতটা দেব আরাধনা, তারচেয়ে লোকোৎসব ততটাই বেশি। একটা সময়ে বরিশাল অঞ্চলে এর ব্যাপক প্রচলন ছিল। অনেক গ্রামেই আয়োজন হতো নীলপূজার। এ উৎসব কেন্দ্র করে গাঁয়ের মানুষের মধ্যে উৎসাহের ঢল নামতো। বাংলা সনের শেষ তিন-চার দিনে বা কোথাও সপ্তাহব্যাপী এর আয়োজন হলেও প্রস্তুতি শুরু হতো বেশ আগে থেকে। আর শুরুর সময় থেকেই গাঁয়ের অধিকাংশ মানুষ কোনও না কোন ভাবে উৎসবে জড়িয়ে থাকতো। যদিও সময়ের ব্যবধানে নীলপূজার সংখ্যা অনেক কমে গেছে। কোথাও কোথাও তা নিয়ম রক্ষায় রূপ নিয়েছে।

‘নীলপূজা’ বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত। যেমন বাংলাদেশের অনেক অঞ্চলে এটি ‘চড়কপূজা, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মালদহ অঞ্চলে ‘গম্ভীরাপূজা’, দিনাজপুরে ‘গমীরাপূজা’ নামে পরিচিত। আবার বহু জায়গায় তা ‘শিবের গাজন’ নামেও পরিচিতি লাভ করেছে। নামে বিভিন্নতা যাই থাক, বাস্তবে তা শিবের পূজা।
চৈত্র মাসের শেষ দিনে অর্থাৎ চৈত্রসংক্রান্তির দিনে মূল উৎসব তথা প্রধান পূজা করা হয়। তার আগে কোথাও কোথাও সপ্তাহব্যাপী ‘ফলপূজা’, ‘কাদাপূজা’সহ বিভিন্ন নামে পূজার আয়োজন হয়।

বরিশাল অঞ্চলে প্রধানত শেষ তিনদিন ‘গিরিসন্যাস’, ‘হাজরা’ ও ‘নীলসাঙ্গ’ নামে পূজার আয়োজন হয়।
সনাতন ধর্মীয় জনগোষ্ঠির প্রধান প্রধান ধর্মীয় গ্রন্থে নীলপূজা কিংবা চড়কপূজা, যাই বলা হোক, তার কোন উল্লেখ নেই। লিঙ্গপুরাণ, ব্রহ্মপুরাণের মতো কোন কোন পুরাণে চৈত্র মাসে শিব আরাধনা প্রসঙ্গে নৃত্যগীতের উল্লেখ আছে। তাতেও নীলপূজার কোন উল্লেখ নেই। এমনকি পঞ্চদশ-ষোড়শ শতাব্দীতে রচিত গোবিন্দানন্দের ‘বর্ষক্রিয়াকৌমুদী’ এবং রঘুনন্দনের ‘তিথিতত্ত্ব’-তেও চড়ক কিংবা নীলপূজার উলে¬খ মেলে না। তবে নীলপূজা বা চড়কপূজা নিয়ে বিভিন্ন ধরণের জনশ্রুতি প্রচলিত আছে। যার একটি হচ্ছে, ১৪৮৫ সালে সুন্দরানন্দ ঠাকুর নামের এক রাজা চড়কপূজার প্রচলন করেন। রাজপরিবারের লোকজন এই পূজা শুরু করলেও চড়কপূজা কখনও রাজ-রাজড়াদের পূজা ছিল না। আরও জনশ্রুতি রয়েছে, পাশুপত নামক এক শৈব সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রাচীনকাল থেকেই এই উৎসব পালিত হয়ে আসছে। কারও মতে কারও মতে, পরম শিবভক্ত বাণরাজা যুদ্ধ করেছিলেন দ্বারকার অধিপতি তথা বিষ্ণুর অবতার কৃষ্ণের বিরুদ্ধে। যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত বাণরাজা অমরত্ব পাওয়ার আশায় চৈত্র মাসের শেষ দিনে অনুচরদের নিয়ে নাচে-গানে আত্মহারা হন এবং নিজের শরীরের রক্ত বের করে সমর্পণ করেন শিবের উদ্দেশে। সেই ঘটনার স্মৃতিতেই বিভিন্ন ভাবে দৈহিক যন্ত্রণাকে ধর্মের অঙ্গ বলে বিবেচনা করা হয়। তবে তা চড়কপূজা ছিল না।

তাই চড়কপূজাকে পৌরাণিক উৎসব না বলে লোকোৎসব বলাই ভালো। বরিশাল অঞ্চলের বেশির ভাগ নীলপূজার আয়োজক নিজেদেরকে বাণরাজার অনুসারী বলে মনে করেন। অনেকে নিজেদের বাণরাজার উত্তরসূরী বলেও মনে করেন।

শিবের গাজনও অনেকটা চড়কপূজার মতোই। শিবের গাজন আয়োজনকারী অনেকের মতে-শিবের গাজনের উৎপত্তি ধর্মঠাকুরের গাজন থেকে। শিবের আর্শীবাদ লাভের আশায় সপ্তাহব্যাপী তারা নানা পূজার আয়োজন করেন। এ সংক্রান্ত ধর্মমঙ্গল গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে, রানী রঞ্জাবতী ধর্মঠাকুরকে সন্তুষ্ট করতে গাজনের আয়োজন করেছিলেন। কারও কারও মতে-গাজনে বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব রয়েছে।
সনাতন ধর্মে একটা সময়ে জাতপাতের ব্যাপক প্রভাব ছিল। নিচু সম্প্রদায়ের লোকজন সর্বদাই শিবকে নিজেদের পরিবারের একজন বলে মনে করতেন। যে কারণে তাদের মধ্যেই নীলপূজার প্রচলন বেশি। আয়োজকরা পূজার জন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুরোহিত হিসেবে ব্রাহ্মণদের আমন্ত্রণ জানাতেন না। নিজেরাই পুরোহিত হতেন। সাধারণত আয়োজকদের যে কেউ পুরোহিত হতে পারেন। তবে পুরোহিত হতে গেলে মাসব্যাপী উপবাস, ফলাহার, হবিষ্যি করার মতো কঠিন নিয়ম কানুন পালন করতে হয়। যদিও এসব নিয়ম এখন অনেকটাই শিথিল হয়ে পড়েছে। এখন শুধুমাত্র এক মাস বা এক সপ্তাহ নিরামিষ আহারে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।

বরিশাল অঞ্চলে নীলপূজার আয়োজকরা পূজার বেশ কয়েকদিন আগে থেকে কয়েকজনের একটি দল নিয়ে গ্রামের পর গ্রাম ঘুরে বেড়ান। দলে একজনকে শিব এবং এক বা দুইজনকে গৌরী সাজানো হয়। কোন কোন দলে কালী, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ, অসুর এমনকি দুর্গার বাহন হিসেবে সিংহ সাজতেও দেখা যায়। আবার কোন কোন দলে রাধাকৃষ্ণও থাকে। প্রতিটি দলে একজন শক্ত সমর্থ পুরুষকে বিশেষ সাজ দেয়া হয়। যারা সারা শরীরে থাকে অদ্ভুদ পোশাকের ওপরে মাছ ধরার ছেড়া জাল। বেশ লম্বা লেজ। মাথায় পাগড়ি। তারওপরে লাল জবাফুল। মুখমন্ডলে রংয়ের প্রলেপ। লম্বা দাঁড়ি। চোখে কালো চশমা। হাতে কাঠের তরবারি। কেউ তাকে বলেন শশ্মানচারী শিব। আবার কেউ বলেন সন্যাসী। কেউবা বুড়ো শিব বা নীল পাগল। দলে থাকে ঢোল মন্দিরাসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র। বাড়ি বাড়ি ঘুরে শিবের ভক্তিমূলক গানের সঙ্গে চলে নৃত্য। প্রায় সবার পায়ে বাঁধা থাকে ঘুঙুর। তাদেরকে স্থানীয় ভাষায় নীল পাগলের দল বলা হয়। নীল পাগল বলার একটি মর্মাথ্য রয়েছে। মহাদেব নিজ কণ্ঠে বিষ ধারণ করেছিলেন। তাই তার আরেক নাম নীলকণ্ঠ। সেখান থেকে এসেছে নীল পাগল শব্দটি। নীল পাগলের দল যখন যে বাড়িতে যায়, সে বাড়ির নারীরা তাদের উলুধ্বনি দিয়ে বরণ করেন। পূজার উপকরণ হিসেবে চাল-কলা থেকে শুরু বিভিন্ন ফলফলাদি দেয়া হয়। নগদ অর্থ দেয়া হয়। বাড়ির মহিলারা পরিবারের মঙ্গল কামনায় নীল পাগলের আর্শীবাদ প্রার্থনা করেন।

বাংলাদেশের যে সব এলাকায় চড়কপূজা করা হয়, সেসব এলাকায় চড়ক গাছ নামে একটি বিশেষ গাছ দেখতে পাওয়া যায়। সারা বছর গাছটি পুকুরে ডোবানো থাকে। পূজার দিন গাছটি তুলে পরিষ্কার করে মাটিতে বসানো হয়। গাছটিকে শিবের প্রতীক এবং মাটিকে পার্বতীর প্রতীক মনে করা হয়। তারমানে চড়কপূজা মানে শিব-পার্বতীর মিলন।

চড়কপূজায় প্রথমে ‘শিবপাঁচালী’ থেকে মন্ত্র পড়েন পুরোহিত বা সন্যাসীরা। শিবের নামে জয়ধ্বনি দিয়ে সন্যাসীরা নদীতে স্নান করতে যান। স্নান শেষ করে মাটির কলসী ভরে জল আনেন সন্ন্যাসীরা। এরপর চড়ক গাছের চারপাশে গোল হয়ে দাঁডান সন্ন্যাসীরা। আবার শিবপাঁচালী পাঠ করতে থাকেন সন্ন্যাসীরা। চড়ক গাছে জল ঢেলে প্রণাম করেন। এরপরে তাদের পিঠে, হাতে, পায়ে, জিহ্বায় এবং শরীরের নানা অংশে বান-শলাকা বিদ্ধ করা হয়। কখনও কখনও জ্বলন্ত লোহার শলাকা তাদের গায়ে ফুঁড়ে দেয়া হয়। তারপর তাদেরকে চড়ক গাছে একটি চাকার সঙ্গে বেঁধে ঘোরানো হয়। সন্ন্যাসীদের আর্শীবাদ লাভের আশায় অভিভাবকরা তাদের শিশুসন্তানদের শূন্যে তুলে দেন। সন্ন্যাসীরা ঘুরতে ঘুরতে কখনও কখনও শিশুদের মাথায় হাত দিয়ে আর্শীবাদ করেন। এক অদ্ভুত উন্মাদনা। এ অবস্থায় এক হাতে বেতের তৈরি বিশেষ লাঠি ঘোরাতে থাকেন সন্ন্যাসীরা, আর অন্য হাতে দর্শনার্থীদের উদ্দেশে বাতাসা ছোড়েন। তাদের বিশ্বাস, শিব ঠাকুরের সন্তুষ্টি লাভের জন্য স্বেচ্ছায় তারা কঠিন আরাধনার পথ বেছে নিয়েছেন। সন্ন্যাসীদের একটাই আশা, শিব ঠাকুর তাদের স্বর্গে যাওয়ার বর দেবেন। যদিও আজকাল এসব নির্মম প্রথা বন্ধ হয়ে গেছে।

বরিশাল অঞ্চলে নীলপূজার প্রচলন বেশ প্রাচীন। চন্দ্রদ্বীপ রাজাদের আমলে এর প্রসার ঘটে। ঐতিহাসিক তথ্য বলছে, বরিশাল অঞ্চল একটা সময়ে লোকবসতি কম ছিল। মগ ও পর্তুগীজ জলদস্যুদের আক্রমন, লুটতরাজ, মানুষ হত্যাসহ নানাবিধ অত্যাচার-নির্যাতনে বহু অঞ্চল বিরাণ ভূমিতে পরিণত হয়। সে সময়ে চন্দ্রদ্বীপের রাজারা দেশের নানা প্রান্ত থেকে লোকজন এনে বরিশাল অঞ্চলে পুর্নবাসিত করেন। এইসব লোকজনদের অধিকাংশ ছিল নি¤œ বর্ণের হিন্দু। যারা শিবের আরাধনা অর্থাৎ নীলপূজার প্রচলন করেন। চন্দ্রদ্বীপের রাজারা সে সময়ে প্রজাদের নীলপূজায় উৎসাহ দিতেন এবং নানাভাবে সহায়তা করতেন। যে কারণে প্রায় প্রতিটি গ্রামে নীলপূজা ছড়িয়ে পড়ে। রাজারা পৃষ্টপোষকতা করতেন বলে নীল পাগলের দলকে বহু জায়গায় রাজাদের দল বলা হতো। প্রত্যেকটি পূজা হতো বেশ জাকজমকের সঙ্গে।

চার-পাঁচ দশক আগেও বরিশালের অনেক গ্রামে নীল পূজা হতো। বিশেষত পটুয়াখালীর কালিশুরি, ধরান্ধি, গোলখালী, গাবুয়া গ্রামের নীল পূজা এতদাঞ্চলের বিখ্যাত ছিল। পূজাগুলোতে হাজারো মানুষের ঢল নামতো। এখন সে সব প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

নীলপূজার সংখ্যা কমে গেছে বা বন্ধ হয়ে গেছে, এটি যেমন সত্য। তারচেয়েও বড় সত্য হচ্ছে, নীল পূজার সঙ্গে প্রচুর লোকজ গানের ভান্ডারও বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। যা আমাদের আবহমান বাংলার সংস্কৃতিকে সঙ্কুচিত করছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো সংবাদ পড়ুন

নিউজ ক্যাটাগরি

©দৈনিক বাংলার ঐতিহ্য (2019-2020)